ভাগ্য রজনী "শবে বরাত" এর গুরুত্ব এবং ফজিলত
ভাগ্য রজনী "শবে বরাত" এর গুরুত্ব এবং ফজিলত

ভাগ্য রজনী “শবে বরাত” এর গুরুত্ব এবং ফজিলত – সবাইকে জানিয়ে দিন

মহা ফজিলত পুর্ণ ও বরকতময় রাত লাইলাতুল বরাত। শবে বরাত ফরাসি শব্দ। সবে অর্থ রাত আর বরাত অর্থ ভাগ্য। সেই হিসেবে শবে বরাতের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সৌভাগ্যের রাত্রি। এই রাত মুসলিম জাতির ভাগ্য রজনী বা শবে বরাত। সোমবার দিনগত রাতটিকে পবিত্র সবে বরাত হিসেবে পালন করবে মুসলিম উম্মা।

মানুষ সৃষ্টি করার আগে মহান আল্লাহ তায়ালা তার ফেরেশতাদের ডেকে বললেন, আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি পৃথিবীতে পাঠাতে চাই। তখন ফেরেশতাগণ বললেন ইয়া রব্বুল আলামিন কেন মানুষ সৃষ্টি করবেন? আমরা তো আপনার এবাদত করছি। মানুষ সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠালে তারা সেখানে গিয়ে ঝগড়া বিবাদ মারামারি, কাটাকাটি ইত্যাদি করবে (সুরাঃ বাকারা)।

তবুও অনেক মহাব্বত করে মহান রব্বুল আলামিন ১৮ হাজার মাকলুকাতের মধ্যে মানুষকে ”আশরাফুল মাখলুকাত” করে সৃষ্টি করেছেন। ”আশরাফুল মাখলুকাত” অর্থ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। পৃথিবীতে যত মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আল্লাহ তায়াল সৃষ্টি করেছেন।

মানুষ সৃষ্টির সুচনা লগ্নে মানুষের বয়স ছিল ১শ’ থেকে ২’শ বছর। তখনকার মানুষ ১শ’ থেকে ২শ’ বছর বেঁচে থেকে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত বন্দেগী করে তারা সন্তুষ্টি অর্জন করেছে কিন্তু আল্লাহ তায়ালা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মতগণের বয়স কম করে দিয়েছেন। আগে যেখানে মানুষ একশ থেকে দুশ’ বছর বেঁচে থেকে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করে তার সন্তুষ্টি লাভ করেছে, সেখানে হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উম্মতগণ ৬০ থেকে ৮০ বছর বেঁচে থেকে কিভাবে আগেকার মানুষের মত ইবাদত বন্দেগী করবে এবং তার সন্তুষ্টি অর্জন করবে।

সেই জন্য হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উম্মতগণের জন্য মহান রব্বুল আলামিন কয়েকটি রজনী, পর্ব বা উপলক্ষ্য দান করেছেন। এই রজনীগুলোতে নানা রকম ইবাদত বন্দেগী করবে তাহলে আগেকার উম্মতগণের মত হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উম্মতগণও পুর্ণ লাভ ও মহান রব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে। যে সকল রজনী পর্ব বা উপলক্ষ্য পুর্ণ আন্তরিকতার সহিত মহান পালনকর্তার বন্দেগী করে ষাট থেকে আশি বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনের পূর্ব কালের শত সহস্র দীর্ঘায়ূ প্রাপ্ত ব্যক্তিগণের সমান নেকী ও সওয়াব লাভ করতে পারবে। সেই সব রজনী, পর্ব বা উপলক্ষ্যের মধ্যে গুরুত্ব ও ফজিলতের দিক থেকে যার স্থান দ্বিতীয় বা রজমানের পরই যে পর্ব, রজনী বা উপলক্ষ্য প্রতি বছর সাবান মাসের আমাদের নিকট এসে থাকে।

চন্দ্র মাসের অস্টম মাস সাবান। সাবানের চাঁদ এমন একটি ফজিলত পুর্ণ ও বরকত ময় রাত আছে, সেই রাতে ইবাদত বন্দেগী করলে অসীম ছওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়। সেই রাত্রির নাম লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাত। আজ ১৪ই শাবান দিবগত রাত্রি সেই ফজিলতপুর্ণ ও বরকতময় রাত শবে বরাত। এ রাতে গুনাগার বান্দারা আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে ক্ষমা লাভ করবে বলে এ রাতের নাম লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাত নাম করণ করা হয়েছে। এ নাম হতে এ রাতের ফজিলত ও গুরুত্ব বিষয়ে অতি সহজেই অনুমেয়।

এ সম্পের্কে পবিত্র আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, হুজুরে পাক (সাঃ) সাবান মাস সম্পর্কে এত বেশী খেয়াল রাখতেন যে রমজান মাস ছাড়া অন্য কোন মাস সম্পর্কে ততটা বেশী খেয়াল রাখতেন না। নবী করিম (সাঃ) আরো বলেছেন, রমজানের জন্য তোমরা সাবান চাঁদের হিসেব রাখ। কারণ সাবানের চাঁদের হিসাব নির্ভূল বা সঠিক হলে রমজানের চাঁদের হিসেব হতে অসুবিধা হবে না।

হযরত আশেয়া সিদ্দিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা রাতে আমি হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) কে বিছানায় দেখতে না পেয়ে তাহার খোজে বাহিরে গেলাম, তিনি তখন জান্নাতুল বাকী নামক কবর স্থানে ছিলেন। তিঁনি (সাঃ) বললেন, আমার নিকট জিব্রাইল (আঃ) আসিয়া বললেন যে, আজ সাবানের ১৫ই রাত। এই রাতে আল্লাহ তায়ালা যতগুলি গুনাগার বান্দাকে মাফ করে দেন। যতগুলি লোক বণী কলব গোত্রের পালের মধ্যে ছাগ পালের গায়ে রয়েছে। ঐতিহাসিক গণের মতে ঐ গোত্রের পালের মধ্যে ২০ হাজারের বেশী বকরী ছিল। কিন্তু যারা আল্লাহর সহিত অন্য কাউকে শরিক করে, নিজেদের বাবা মায়ের সাথে নাফারমানি করে, যারা অন্যের প্রতি ইর্শ্বা প্রশোন করে, আরা যারা পায়ের গাঁটের নীচে পর্যন্ত পায়জামা বা লুঙ্গি পরিধান করে তারা এই ব্যাপক ক্ষমা লাভের রাতেও আল্লাহ তায়ালার রহমত ও ক্ষমা লাভ করতে পারবেনা (রায়হাক্কী)।

অন্য একটি রেওয়াতে বর্ণিত আছে, সাবান মাসের ১৫ তারিখ রাতে মহান রব্বুল আলামিন সমগ্র সৃষ্টিকুলের প্রতি বিশেষ রহমত ও নেক নজরে তাকান এবং যাকে খুশি তাকে মাফ করে দেন। যা চায় তাই দেন। আরেকটি হাদিস শরীফে হুজুরে পাক (সাঃ) ফরমাইয়াছেন, যে ব্যক্তি লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাতের রাতে সারা রাত জেগে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করবে আল্লাহ তায়ালা তার একশ থেকে দুইশ বছর জীবনের গুনাহ মাফ করে দিবেন।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) হতে অপর একটি হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে এক রাতে হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) তাহাজ্জুত নামাজ পড়তে শুরু করলে। সেজদায় গিয়ে তিনি এত দীর্ঘ সময় থাকলেন যে, তাহা দেখে আমি ভাবলাম তাহার রুহু কবজ হয়ে গেল নাকি? তাই ভাবিয়া শঙ্কিত হয়েছিলাম। এমনকি আমি বিচলিত হয়ে আমি তার নিকটে গিয়ে বৃদ্ধ আঙ্গুলি ধরে নাাড়া দিলাম। ফলে তিনি নড়ে উঠলেন। তারপর আমার অন্তরে শান্তি ফিরে আসল। আর আমি আমার নিজের জায়গায় চলে গেলাম।

নামাজ শেষ করে কয়েকটি কথার পর তিনি আমাকে বললেন- আয়েশা আজ কোন রাত তা তুমি জান কি? উত্তরে আমি বললাম আল্লাহ তায়ালা এবং তার রাসুল ই ভালো জানেন। তিনি (সাঃ) তখন বললেন- আজ সাবানের ১৫ই রাত্রি বা শবে বরাতের রাত। এই রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াবাসীর প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দিয়ে তাকান। যারা তার দয়া ও করুনা ভিক্ষা চায় তাদের প্রতি করুনা বর্ষন করে। কিন্তু পরস্পর শুত্রুতা পোষনকারী লোকদের তাদের নিজ নিজ অবস্থার উপর ছড়ে দেন। অর্থ্যাৎ এই রহমতের রাতেও তারা ক্ষমা লাভ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন।

মহানবী (সাঃ) বলেছেন শবে বরতের পরবর্তী বছরের কে পৃথিবীতে জন্মগ্রহন করবে এবং কে মৃত্যু বরন করবে তা এ রাতে লেখা হয়ে থাকে। এ রাতে বণি আদমের আমল নামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। আর এই রাতেই তাদের রিজিক বন্টন করা হয়ে থাকে। অপর একটি হাদিস শরীফে বিখ্যাত সাহাবী হযরত আত ইবনে ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে শবে বরাতের রাতে মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত আজরাইল (আঃ) একটি তালিকা দেয়া হয়। সেই তালিকায় পরবর্তী বছরে যারা মৃত্যু বরন করবে তাদের নাম লেখা থাকবে।

হুজুরে পাক (সাঃ) এরশাদ ফরমাইছেন, যখন শাবান মাসের ১৫ই রাত অর্থ্যাৎ ১৪ তারিখের দিবাগত রাত আসবে তখন তোমরা রাত্রি জাগরণ করে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত বন্দেগী করবে এবং তার পরবর্তী দিনে রোজ রাখবে। কেন না ঐ রাতের সুর্যাস্তের পরই আল্লাহ পাক সর্বনিম্ন আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদেরকে ডেকে ডেকে বলেন কে আছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, যাকে আমি ক্ষমা করব, কে আছে রিযিক প্রার্থনাকারী, যাকে আমি রিযিক দিব, কে আছে বিপদগ্রস্ত যে বিপদ মুক্তি প্রর্থনা করবে এবং আমি তার বিপদ থেকে মুক্ত করে দিব।

অতপর হুজুরে পাক (সাঃ) এরশাদ ফরমাইলেন সারাটি রাত এভাবে বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টিতে দেখেন (ইবনে মাজ)।

উপরোক্ত হাদিস শরীফের আলোকে আমরা অতি সহজে বুঝতে পারছি পরম করুাময় মহান রব্বুল আলামিন কত রহমত, ফজিলত ও মহা বরকতময় রাত দান করেছেন এ রাতে তিনি আমাদের আগামী বছরের সবকিছু নির্ধারণ করবেন। তাই এ রাতে আমাদের অনেক কিছু করণীয় আছে। এ রাতে করনীয় সর্ম্পকে এবাদত বন্দেগীর কথা বলা রয়েছে।

কোরআন শরীফে বলা হয়েছে ’’সেজদা কর এবং আল্লাহর নৈটক্য অর্জন কর।” বান্দা সকল কাজের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হচ্ছে আজিযী’ও এনকেসারী’ অথাৎ কাকুতি-মিনতি ও আকুলতা-ব্যাকুলা। তাই নামাজের মাধ্যমেই আল্লাহর নিকট বান্দার কাকুতি-বিনতি সবচেয়ে বেশী প্রকাশ পায়। তারপরে কোরআন তোলাওয়াত করার কথা বলা হয়েছে।

পবিত্র কোরআন শরীফে বলা কালামুল্লাহ শরীফ তোলাওয়াত করা সর্বোত্তম যিকির। এ সর্ম্পকে মহানবী (সাঃ) বলেছেন, লোহায় পানি লাগলে তাতে যেমন মরিচা পড়ে তেমনি গুনাহ করতে মানুষের অন্তরে কালো দাগ পড়ে। আর এই কালো দাগদূর করা সম্ভব বেশী বেশী মৃত্যুর কথা স্মরণ করা এবং কোরআন তোলাওয়াত করা।

এ রাতে কবর জিয়ারত করার কথা বলা হয়েছে, মৃত্যুরা আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে। কোন কোন আত্মীয় আমার জন্য দোয়া করে। এ সর্ম্পকে হাদিস শরীফে উম্মুল-মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিীকা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম (সাঃ) শবে বরাতের রাতে ”জান্নাতুল বাকী”নামক স্থানে কবরের পার্শে তাশরীফ নিয়ে মৃত্যু ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করেছেন।

আর একটি হাদিসে বলা হয়েছে মুরদারা হচ্ছে নদীতে ডুবন্ত বিপদ গ্রস্থ ব্যক্তির মতো। কেউ পানিতে পড়ে গেলে সে যখন তাকে উদ্ধার করার জন্য লোকদের নিকট করুনা ফরিয়াদ জানায়, তেমনি কবরের মুরদাগণ প্রত্যাশা করে (নুরুছ্ছুদূর)। শবে বরাত উপলক্ষে ১ দিন অথবা ৩ দিন রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে, তিনটি রেজা রাখলে ১৪,১৫,১৬ তারিখে এবং ১ টি রোজা করলে ১৫ ই শাবানে রাখতে হবে।

উপরোক্ত আলোচ্য বিষয় ছাড়া শবে বরাত রাত্রে আর কোন আমল কোরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নেই। শবে বরাত উপলক্ষ্যে হালুয়া-রুটি তৈরী করা, মোমবাতী জ্বালানো, আতশবাজী ও পটকা ফোটানো ইত্যাদি কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এগুলোর কোন প্রথা ? বিদাত ও গুনাহের কাজ। এগুলো কাজ থেকে নিজেকে দুরে রেখে এবং অপরকে দুরে রেখে গোটা মুসলিম জাতী একান্ত কাম্য পরস্পরের প্রতি হিংসা থেকে নিজেকে দুরে সরে নিয়ে আজকের এই রাতে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে অতীত জীবনের সকল ছোট বড় গুনাহ ক্ষমা চেয়ে প্রার্থনা করা।

আমাদের জীবনের সকল গুনাহর কাজ থেকে দুরে থাকতে চেয়ে সকল বিপদ আপদ থেকে মুক্ত রেখে সুন্দর, সুখময় জীবন , মৃত ব্যক্তিদের জন্য দেশ ও জাতীর কল্যাণ কামনা করে পরম করুনাময় বিশ্ব ভূখন্ডের মালিক মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া প্রার্থনা করা আমাদের সকলের একান্ত কাম্য।