ডিবি পুলিশের ১২ সদস্যকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন

র‌্যাব পরিচয়ে ক্লাবে অভিযান নাটক – ডিবি পুলিশের ১২ সদস্যকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন

রাজধানীর কাফরুলে একটি ক্লাবে ‘র‌্যাব পরিচয়ে মোবাইল ফোন ও টাকা কেড়ে নেওয়ার’ অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রুহুল আমিনের নেতৃত্বাধীন টিমসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশের কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ৩ ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যদের শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকা- ঠেকাতে বেশকিছু সুপারিশও করেছে তদন্ত কমিটি।

গতকাল ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। পুলিশ কমিশনার অভিযোগের মাত্রানুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে জানা গেছে।

তদন্ত কমিটি এসি রুহুল আমিনের নেতৃত্বাধীন টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু, ঢাকার মহানগর পুলিশের বাইরে বদলি এবং গোয়েন্দা পুলিশ থেকে বদলি করার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে এসি রুহুল আমিনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করার সুপারিশ করা হয়। তদন্তে যেসব নতুন পুলিশ সদস্যের নাম এসেছে তারাও এসি রুহুল আমিনের টিমের সদস্য।

তদন্ত কমিটির সদস্য মিরপুর জোনের ডিসি মাসুদ আহমেদ বলেন, তারা তদন্তে যা পেরেছেন তার বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। ইতোমধ্যে পুলিশ কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এখন পুলিশ কমিশনার এ ব্যাপারে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।

গত ১৮ এপ্রিল রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল অভিযানের নামে সাধারণ পোশাকে কাফরুলের ‘নিউ ওয়েভ’ ক্লাবে যায়। ডিবির (পূর্ব-অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার দল) সহকারী কমিশনার রুহুল আমিনের নেতৃত্বে ১১ জন ছিল ওই টিমে। ওই সময় ক্লাবে জুয়াখেলা হচ্ছে অভিযোগ এনে তারা ক্লাবে থাকা লোকজনের মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা নিয়ে নেন। পরিচয় জানতে চাইলে ডিবি পুলিশ সদস্যরা নিজেদের কেউ র‌্যাব, কেউ সেনাবাহিনীর সদস্য পরিচয় দেন। এরপর ক্লাবে অবস্থানরত এক সেনা কর্মকর্তার স্বামীসহ চারজনকে আটক করে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশের সদস্যরা।

কিন্তু কাফরুল এলাকায় সেনানিবাসের ফটকের চেকপোস্টে মিলিটারি পুলিশ ওই গাড়িটি থামায়। এ সময় ডিবি পুলিশের গাড়িতে থাকা আটকরা নিজেদের ভুক্তভোগী ও মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন। এতে ডিবি পুলিশের গাড়িটি আটকে রাখে মিলিটারি পুলিশ। পরে কাফরুল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে অভিযানে অংশ নেওয়া ১১ ডিবি সদস্যকে থানায় নিয়ে যান।

এ ঘটনা জানার পর ঢাকার পুলিশ কমিশনার এসি রুহুল আমিনসহ ওই ১১ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। ঘটনা তদন্তে গঠন করেন ৩ সদস্যের একটি কমিটি। কমিটির সদস্যরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (গোয়েন্দা) অতিরিক্ত কমিশনার জামিল আহমেদ, যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় ও পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আহমেদ। তারা ৬ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ করে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ কমিশনারের কাছে তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেন।

কমিটি তদন্তকালে ‘নিউ ওয়েভ’ ক্লাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীর যে ৪ জনকে আটক করা হয়েছিল তাদের, আভিযানিক দলটির সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট আরও বেশ কয়েকজনের বক্তব্য গ্রহণ করেন। কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে অভিযানিক দলের নেতা এসি রুহুল আমিন ‘নিউ ওয়েভ’ ক্লাবে অভিযানে যাওয়ার আগে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো পূর্বানুমতি নেননি। তেমনি অনুমতি ছাড়াই তারা নিজেদের অধিক্ষেত্রের বাইরে এ অভিযান চালায়। তারা কয়েকদফা ওই ক্লাবে অভিযান চালিয়ে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে লিপ্ত হয় বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া গোয়েন্দা পুলিশের কোনো সদস্য যেন বিভাগীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে না জড়ায় সে ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

গোয়েন্দা পুলিশের এসি রুহুল আমিনের টিম শুধু ১৮ এপ্রিল রাতেই নয়, এর আগেও ‘নিউ ওয়েভ’ ক্লাবে গিয়ে অভিযানের নামে কয়েকদফায় ১৭ লাখ টাকা নিয়ে আসে। কয়েকজনকে ক্লাবে আটক করে আবার টাকার বিনিময়ে ছেড়েও দেয়।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে গোয়েন্দা পুলিশের এক শ্রেণির সদস্যের মধ্যে চাঁদাবাজির প্রবণতা বেড়ে গেছে। টাকার জন্য এসব সদস্য নিরীহ প্রকৃতির মানুষকেও আটক করে ৩৬ মিন্টো রোডে নিয়ে আসে। এরপর টাকার দেনদরবার করে টাকা পেলেই তাদের ছেড়ে দেন। আর না পেলে তাদের পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়। বিশেষ করে যেসব সহকারী কমিশনার গোয়েন্দা পুলিশে নতুন যোগ দিয়েছেন তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকা-ে জড়ানোর ঘটনা বেশি। এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ সোর্স নতুন যোগ দেওয়া সহকারী কমিশনারদের টার্গেট করে তাদের দিয়ে নানা শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ করায়। এসব কাজ থেকে অর্জিত টাকার একটি অংশ সোর্সরা পেয়ে থাকেন।

Source: Amader Somoy