বিভিন্ন ব্যাংকের ১৭ হাজার কোটি টাকা লুটকারী এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংক!

বিভিন্ন ব্যাংকের ১৭ হাজার কোটি টাকা লুটকারী এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংক!

চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নামে চারজন মানুষ নিহত হওয়ার জন্য যে কোম্পানির নাম উঠে এসেছে সেই এস আলম গ্রুপের এতো টাকা এলো কোথা থেকে তা নিয়ে নানা আলোচনা আছে। দেশের ব্যাংকিং সেক্টর থেকে হরিলুট করে গতবছর ১৭ হাজার কোটি টাকা এস আলম গ্রুপ আত্মসাৎ করে বলে অভিযোগ আছে।

উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষার সর্বাধিক প্রচারিত ঠিকানা’য় এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সে সংবাদে উল্লেখ করা হয়, এস আলম গ্রুপ ‘ইনল্যান্ড বিল’ পার্চেজ করেই আত্মসাৎ করে ১৭ হাজার কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, তাদের ব্যাপারে সরকারের প্রভাবশালীদের আশীর্বাদ ও সহযোগিতা রয়েছে বলেই কেউ কিছুই বলছে না। তারা টাকা দিয়ে সবাইকে ম্যানেজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান এই বিষয়ে জানলেও ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হননি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মহা কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামে। এক ব্যাংক থেকে টাকা অন্য ব্যাংকে নেয়া হয়েছে। ঋণ নেয়া ব্যাংকের টাকা কাগজে-কলমে লেনদেন করে পরিশোধ দেখানো হলেও আবার ওই টাকা নতুন করে ঋণ দেয়া হচ্ছে। ফলে ব্যাংকের মূল টাকা চলে গেছে চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত গ্রুপ এস আলমের হাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের হিসাব মতে, ওই টাকার পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি। ওই টাকা নেয়া হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক রয়েছে।

সূত্র জানায়, এস আলম গ্রুপের মালিক আলহাজ মো. সাইফুল আলম মাসুদ নানা কৌশলে ও সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে প্রভাবশালীদের দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে কেবল ইনল্যান্ড বিল পার্চেজ (আইবিপি) করেই নেন ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা ফান্ডেড দায়। এসব টাকা নেয়া হয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা, আগ্রাবাদ শাখা, রূপালী ব্যাংক আন্দরকিল্লা শাখা, লালদীঘির পূর্বপাড় শাখা, খাতুনগঞ্জ শাখা, আমিন মার্কেট শাখা, জনতা ব্যাংক লালদীঘির পাড় ও আগ্রাবাদ শাখা, অগ্রণী ব্যাংক লালদীঘির পাড় শাখাসহ সেখানকার আরো একটি শাখা।

গত বছরের প্রথম ছয় মাসে সুগার ও ফুড গ্রেইনের নামে আইবিপি করে এই ১৭ হাজার কোটি টাকা তারা হাতিয়ে নেয়। এই টাকা ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে তারা ঋণ নিয়েছে। ওই টাকার পরিমাণ আরো ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সূত্র জানায়, ওই টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য তারা আশ্রয় নেয় এমন এক কৌশলের, যা সাধারণভাবে ভাবাও অসম্ভব।

আরও পড়ুন:  পাকিস্তানি হ্যাকারদের কবলে গুগল বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, তারা পাঁচ হাজার ব্যাংক হিসাব খুলেছে। ওই সব হিসাবে বিভিন্নভাবে টাকা লেনদেন হয়। তারা ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ধরনের ঋণ নেয়া ছাড়াও এলসি, এলডিআর করা, বিল ইসু্যকরণসহ বিভিন্ন ভাবে লোন নেয়। আর ওই ঋণের পরিমাণ এক একটির বিপরীতে ২০০০ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, সিমেন্টের উপাদান, গম, তেল আমদানি করার জন্য এক এক জাহাজের জন্য ২০০০ কোটি টাকা থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার এলসি খোলা হয়। আইবিপি করা হয়। আইবিপি এর টাকা পুরোটা তুলে নিলেও এলসির টাকা মাল এলে তারা ওই টাকা আবার অন্য ব্যাংক থেকে এনে ওই হিসাবে জমা করে। এর পরই আবার ব্যাংক তাদের নতুন করে সুবিধা দেয়। অনেক সময় অন্য ব্যাংকের ওপর দায় চাপানো হয়।

ব্যাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র আরো জানায়, এস আলম গ্রুপের নামে আগে এলসি, বিল ও ঋণের ব্যাপারে অনেক অনিয়ম ছিল। তাদের ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে বলার পর তারা টাকা বিভিন্ন জায়গা থেকে এনেও দেয়। কিন্তু আসলে এখন অনিয়ম হলেও ভিন্নভাবে হচ্ছে এটা কাগজে-কলমে ফাঁক থাকে না। কারণ এখন তারা ব্যাংকের টাকাই লেনদেন করছে, নিজেরা টাকা বিনিয়োগ করছে না। কেবল যা করছে, তা হচ্ছে এক শাখা থেকে টাকা অন্য শাখায় ও এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে নেয়ার ঘটনা। আর বিভিন্ন ব্যাংকে ইনল্যান্ড বিল পারচেজ করে টাকা বের করে নিচ্ছে। এই ক্ষেত্রে তারা জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এমডি, ডিএমডি, জিএম, ডিজিএমসহ সবাই সহযোগিতা করছেন। এ জন্য তারা মসোহারা পেয়েছিলেন। কেউ কেউ এখনো পাচ্ছেন।

সূত্র জানায়, অনেকেকেই তারা এককালীন টাকাও দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রামের ডিজিএম মো. সোলায়মান, ইব্রাহিম ভূঁইয়া, আবুল বাসার ও দীপঙ্কর ভট্টচার্য প্রতি মাসে এস আলম গ্রুপের অফিসে যান। সেখান থেকে তারা মাসোহারা নিতেন। সেটি তারা নেন এবং চট্টগ্রামের সেই সময়ের জিএম মাসুম কামাল ভূঁইয়া ভাগ দেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জন্য আবার আলাদা মাসোহারা পাঠান এস আলম। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমরা সবই জানি কিন্তু সবাই ম্যানেজ। তাই কিছুই করতে পারছি না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এস আলমের সবচেয়ে বড় ব্যবসা হচ্ছে চট্টগ্রামে। সেখানে তারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। চট্টগ্রামে তাদের মূল ব্যবসা হলেও ঢাকার অনেক ব্যাংক থেকেও তারা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক থেকেই ঋণ নিয়েছে ১১০০-১২০০ কোটি টাকা। এ ব্যাপারে জনতা ব্যাংকের ডিএমডি গোলাম সারোয়ার বলেন, এস আলম বড় গ্রুপ। তারা বিভিন্ন কোম্পানির নামে ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে অনেক ঋণ তারা নিচ্ছে আবার অনেক ঋণ তারা পরিশোধ করছে। তিনি বলেন, এখন ১১০০-১২০০ কোটি টাকার ঋণ আছে। ওই ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তিনি বলেন, অনিয়ম হয়েছে কি না, সেটা আমি বলতে পারব না।

আরও পড়ুন:  ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ১২০ কি.মি. গতির বুলেট ট্রেন

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন শাখার ডিজিএম মোস্তফা কামাল বলেন, এস আলম গ্রুপ জনতা ব্যাংকসহ অনেক ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছে শুনেছি। ৫-৬ বড় ব্যাংক রয়েছে। সেখান থেকেও টাকা নিয়েছে। তারা জনতার অনেক পুরনো ক্লায়েন্ট। তারা ব্যাংক থেকে টাকা নেয় এবং জমা দেয়। ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে কিনা বলতে পারব না। তবে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা এলসি সুবিধা নিয়ে থাকে। আরো অনেক ধরনের ঋণ পায়। তিনি বলেন, আগে তাদের ঋণের বেলায় অনেক অনিয়ম ছিল। তারা টাকা নিয়ে তা দিত না। এ কারণে তাদের সতর্ক করে টাকা পরিশোধ করার জন্যও বলা হয়। তারা এর পর থেকে টাকা দিচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক কর্মকর্তা এস আলমের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পাওয়ার পাশাপাশি এজন্য এককালীন টাকা পাচ্ছেন। অন্যদেরও সহায়তা করেছেন, যাতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো রিপোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জমা না দেয় এবং তারা যেসব শাখায় টাকা লেনদেন করে ওই শাখা তদন্ত না করা হয়। তার বিভাগের একজন কর্মকর্তা তার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, তিনি টাকা নিয়েছেন এস আলমের কাছ থেকে। তিনি বলেন, তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট আছে। এ কারণে সবাই সুবিধা পান। এমনকি জিএমকে পর্যন্ত তারা ম্যানেজ করে ফেলেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ডিজিএম সোলায়মান দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে ছিলেন। পরে তাকে একবার বদলি করা হয়। তিনি ঢাকায় আসেন বছর তিনেক আগে। তিনি ঢাকায় আসার পর এস আলম গ্রুপের অসুবিধা হওয়ার কারণে এস আলম নিজেই ওপরের মহলের কাছে বলে তাকে আবার বদলি করে নিয়ে যান। এখন তিনি সেখানেই রয়েছেন এস আলমের পক্ষে কাজ করছেন।

জানা গেছে, এস আলম গ্রুপ এর ঋণ ও এলসি কেবল কোম্পানির চেয়ারম্যান ও এমডির নামে আলহাজ মোঃ সাইফুল আলম মাসুদের নামে খোলা হয় বা তার নামে সব করা হয় এমন নয়। তার ভাইদের নামেও করা হয়। তার ভাই তার কোম্পানির পরিচালক রয়েছেন। তারা গ্রুপেরও পরিচালক। ওই ভাইয়েরাও তার ব্যবসা দেখেন। চট্টগ্রাম অফিস ছাড়াও ঢাকায় অফিস রয়েছে। জানা গেছে তার গ্রুপের অধীনে ৩৩টি কোম্পানি রয়েছে।

আরও পড়ুন:  কাপ্তাই হ্রদে আদিবাসী নারীকে গণধর্ষণ, ভিডিও ধারণ

এর মধ্যে ফুড ও ফুড গ্রেইন, তেল, তেল রিফাইন্ড, সিমেন্ট, স্টিল, কোল্ড রোলেড স্টিল, ইস্পাত, প্রাকৃতিক গ্যাস, পাওয়ার জেনারেশন, লাক্সারি চেয়ার কোচ, শিপিং, হাউজিং, ব্যাগ তৈরির কারখানা ছাড়া বিভিন্ন আমদানি-রপ্তানি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এস আলম সয়াসিড এক্সটাকশন পস্ন্যান্ট, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম সুপার এডিবেল অয়েল, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ড্রাস্ট্রি, এই নামে আরো একটি ইউনিট ২, এস আলম ট্রাক টার্মিনাল লিমেটেড, সিমেন্টের মধ্যে রয়েছে, এস আলম সিমেন্ট, পোর্টম্যান সিমেন্ট, স্টিলের মধ্যে রয়েছে-এস আলম স্টিল, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিল, গ্যালকো স্টিল বিডি, গ্যালকো স্টিল বিডি ২, সিমন ইস্পাত লিমিটেড, পাওয়ার ও এনার্জির মধ্যে রয়েছে, কর্নফুলী প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি, শাহ আমানত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি, এস আলম পাওয়ার পস্নান্ট, এস আলম পাওয়ার পস্নান্ট-২, এস আলম পাওয়ার জেনারেশন লিমেটেড, এস আলম লাক্সারি চেয়ার কোচ, শিপের মধ্যে রয়েছে বেয়ারিং সি লাইন, এস আলম অ্যান্ড কোম্পানি, ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মধ্যে রয়েছে এস আলম ব্যাগ ম্যাকুফ্যাকচারিং মিলস লিমিটেড, প্রপার্টিজের মধ্যে রয়েছে, এস আলম প্রপার্টিজ, হাসান আবাসন লিমেটেড, মর্ডান প্রপার্টিজ, ওসেন রিসোর্ট লিমিটেড, প্রাসাদ প্যারাডাইজ লিমিটেড, মেরিন এম্পায়ার লিমেটেড, এগ্রা বেইজ রয়েছে এস আলম হ্যাচারি, ফতিহাবাদ ফার্ম লিমেটেড, ট্রেডিংয়ের মধ্যে রয়েছে এস আলম ব্রাদার্স, এস আলম ট্রেডিং কোঃ, সোনালী কার্গো লজিস্টিকস, সোনালী ট্রেডার্স গেস্নাবাল ট্রেডিং কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আর এসব কোম্পানির মধ্যে সিমেন্ট, সুগার, তেল, ফুড গ্রোইন, খাদ্যশস্য আমদানির নামেই হাজার হাজার কোটি টাকার এলসি করা হচ্ছে। বিল তোলা হচ্ছে। জনতা ব্যাংক আর রূপালী ব্যাংকের এলসি ও বিল করে অন্য ব্যাংকের কাছ থেকেও তারা টাকা তুলে নেয়।

এই বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলে এস আলম গ্রুপের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তাই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়নি।

প্রসঙ্গত, এস আলম গ্রুপ কিছুদিন আগে দেশের প্রথম বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন একুশে টেলিভিশনের মালিকানা কিনে নিয়েছে। অবশ্য এ কাজে সরকারি দলের প্রভাবশালী একজন নেতা তাকে সহায়তা করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *