মহিলাদের জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধের উপায়

মহিলাদের জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধের উপায়

জানুয়ারি মাস মহিলাদের জরায়ুমুখ (সারভিক্স) ক্যান্সার সচেতনতার মাস। বর্তমান বিশ্বে মহিলাদের স্বাস্থ্য সমস্যার অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে জরায়ুমুখ ক্যান্সার। জরায়ুমুখ ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী নারী মৃত্যুর অন্যতম কারণ। আমেরিকায় প্রায় ২০ শতাংশ নারীর মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ভারতেও ২০ শতাংশ মহিলার মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সার দেখা যায়। এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৮ হাজার নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়া মানেই জীবনের দুর্ভোগ। মৃত্যু পরোয়ানা যেন তার দরজায় হাজির হয়ে যায়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে এর চিকিৎসা সহজ। এর প্রতিকার ও প্রতিরোধে সচেতনতা প্রয়োজন।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার একটি যৌনসংক্রামক রোগ। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) দ্বারা এর সংক্রামণ ঘটে থাকে। সাধারণত ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সের মধ্যে এ রোগের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত নারীদের মধ্যে এ রোগের সম্ভাবনা কম থাকে। বাল্যবিয়ে, বিয়েবহির্ভূত যৌনজীবন, যৌনকর্মী ও একাধিক সন্তানের মা এ রোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত। এখানে একজন নারীকেই এ রোগের জন্য দায়ী করা ঠিক নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংক্রমিত পুরুষের মাধ্যমে নারীদেহে এইচপিভি সংক্রমণ ঘটে থাকে। একজন নিরপরাধ নারী একজন বিপথগামী স্বামীর দ্বারা সংক্রমিত হয়ে জীবনযুদ্ধে হেরে যেতে পারেন। পরিবার কেন্দ্রিক জীবনযাপন এ রোগের প্রধান প্রতিরোধক। জীবনের মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক শৃঙ্খলা, যৌন জীবনের সততা ছাড়া শুধু ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা যাবে না।

হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের শতাধিক প্রকারভেদ রয়েছে। এইচপিভি-৬, ১১ সাধারণভাবে যৌনাঙ্গে আঁচিলের জন্য দায়ী, যা ক্রমান্বয়ে ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে। এইচপিভি-১৮ এডিনোকার সিনোমার জন্য দায়ী, যা অল্প বয়সী নারীদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটায়। এইচপিভি-১৬, লার্জ সেল স্কোয়ামাস কার্সিনোমার জন্য দায়ী। এ ছাড়া যাদের হার্পস ভাইরাস টাইপ-২, সংক্রমণ রয়েছে তারা অতি সহজেই এইচপিভি দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। বর্তমান গবেষণায় এইচআইভি (HIV) সংক্রমণের সাথে এইচপিভি সংক্রমণের সংযোগও চিহ্নিত হয়েছে। যারা ধূমপায়ী এবং যৌন রোগ ক্ল্যামেডিয়া দ্বারা সংক্রমিত তারাও এইচপিভি সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এইচপিভি সংক্রমণের পর সহসা কোনো উপসর্গ প্রকাশ নাও হতে পারে। সংক্রমণের এক মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। লক্ষণের মধ্যে যৌনাঙ্গের পাশে ব্যথাযুক্ত আঁচিল দেখা যেতে পারে। উপযুক্ত চিকিৎসা না করলে তা রূপান্তরিত হয়ে ফুলকপির আকার ধারণ করতে পারে। আঁচিল থেকে রক্তপাত হতে পারে, ব্যথাযুক্ত প্রস্রাব, প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে স্রাব নিগর্ত হতে পারে। সংক্রমিত নারী গর্ভধারণকালে আঁচিল অনেক বড় হয়ে যেতে পারে। স্বাভাবিক প্রসবের সময় নবজাতক শিশুর মধ্যেও রোগটি ছড়াতে পারে। সাধারণত রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসেন যৌনমিলনে ব্যথাবোধ এবং মিলনের পর অস্বাভাবিক রক্তপাত নিয়ে। এ ধরনের রোগীদের দুই মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত হয়। দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব যায়। এ ধরনের লক্ষণ নিয়ে যখন রোগীরা আসেন তখন চিকিৎসক তাকে পেপ স্মেয়ার পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে থাকেন। পেপ স্মেয়ার পরীক্ষার আবিষ্কারক Dr. Papanicolaou, তার নাম অনুসারে পরীক্ষার এ নামকারণ। পেপ পরীক্ষায় কোনো অস্বাভাবিকতা পেলে চিকিৎসক তাকে কলপোসকপি করাতে পারেন নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের জন্য। এ ছাড়া রোগ নির্ণয় ও এর বিস্তার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিটি স্ক্যান, এমআরআই পরীক্ষার সাহায্যও নেয়া যেতে পারে।

বিবাহিত মহিলাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক পেপ পরীক্ষা বছরে একবার করা উচিত। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে স্ক্রিনিং পরীক্ষা হিসেবে ভিআইএ (VIA-Visual Inspection by Acetic Acid) ব্যাপকভাবে করা হচ্ছে। এ পরীক্ষাটি ভারতের গ্রাম বাংলার স্বাস্থ্যকর্মীরা বিশেষভাবে ব্যবহার করেন, যেখানে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার সুযোগ সুবিধা নেই। এ পরীক্ষায় পজিটিভ পাওয়া গেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। প্রতিষেধক হিসেবে টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রতিরোধের প্রধান উপায় পবিত্র পারিবারিক জীবনব্যবস্থা। আবারো বলতে হচ্ছে, এ রোগটি নারীদের। কিন্তু এ জন্য নারীকে পুরোপুরি দায়ী করা ঠিক নয়। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে জীবনাচারের বিপথগামিতায় কোনো কোনো নারী এ রোগে আক্রান্ত হন। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন পরিস্থিতি নারীকে বিপথগামিতায় ঠেলে দিলেও প্রকারান্তরে পুরুষরাই এর জন্য দায়ী। বিপথগামী সংক্রমিত পুরুষই নারীর দেহে এ রোগের সংক্রমণ ঘটিয়ে থাকে। কনডম, ভেকসিন ব্যবহার দ্বারা প্রতিরোধ প্রোগ্রামের কথা বলা হলেও পবিত্র চরিত্রের কথা বলা হয় না। এইচপিভি সংক্রমণের পেছনে রয়েছে সমাজের অন্ধকার জগতের হাতছানি। যেকোনো যৌন সংক্রামক রোগের জন্য দায়ী হচ্ছে অবাধ অবৈধ যৌনাচার। আমরা নিশ্চিন্তে বলতে পারি, পরিবার হচ্ছে পবিত্র যৌনজীবনের একমাত্র পথ। যৌনজীবন ধর্মীয় স্বীকৃত একটি পদ্ধতি, যা মানুষের জৈবিক চাহিদা এবং বংশ বিস্তারে সমাজ স্বীকৃত বিধান। সুস্থ এবং সুশৃঙ্খল বিধান অস্বীকার করে কুসংস্কৃতির চর্চা করলে স্বাস্থ্য বিকৃতি ঘটা অতি স্বাভাবিক। সুতরাং, এ ধরনের মারাত্মক ব্যাধি প্রতিরোধে আমাদেরকে ফিরে আসতে হবে ধর্মের পথে, সত্যের পথে এবং সুসংস্কৃতির পথে।
চিকিৎসার জন্য প্রধান শর্ত প্রাথমিকপর্যায়ে রোগ নির্ণয়। অনেকে সামাজিক লজ্জায় রোগ লুকিয়ে রাখেন। অনেক নারী তার বৈধ স্বামীকেও তার কষ্টের কথা লুকিয়ে রাখেন। না এটা করবেন না। খোলাখুলি স্বামীকে আপনার সমস্যার কথা জানান। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে বলুন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আপনার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হোন। ভালো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করুন। বর্তমানে আমাদের দেশেই ভালো চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। হুট করে বিদেশ যাবেন না। আপনি আপনার যোগ্য চিকিৎসক দেশেই পাবেন। অন্য চিকিৎসার মধ্যে হোমওিপ্যাথি চিকিৎসাও নিতে পারেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক ক্যান্সার সোসাইটি আপনাকে উপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারে। মনে রাখবেন, যেখানে সেখানে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা গ্রহণে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

আবারো বলছি, জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধের একমাত্র পথ হচ্ছে পবিত্র পারিবারিক জীবন। ধূমপানের অভ্যাস থাকলে বন্ধ করুন। স্বামীর ধূমপানের অভ্যাসও বন্ধ করুন। কারণ, পরোক্ষ ধূমপান অধিক ক্ষতিকারক। অবশ্য, মহিলারা আমাদের দেশে ধূমপানের চেয়ে সাদাপাতা, জর্দা গুটকা, গুল ইত্যাদি বেশি ব্যবহার করেন। এসব বদাভ্যাস অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।

লেখক :অধ্যাপক ডা: জি এম ফারুক