প্রিয় মহানবী (সা.) এর কিছু অলৌকিক ঘটনা!

প্রিয় মহানবী (সা.) এর কিছু অলৌকিক ঘটনা!

হয়রত মুহাম্মাদ (সা:) বর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। প্রচলিত ধারনা মোতাবেক, তার জন্ম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগষ্ট বা ১২ই রবিউল আওয়াল বা আরবি রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও মহামানব। আকায়ে নামদার তাজেদারে মদীনা, দুলালে আমিনা হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুস্তফা (সা.) যে সত্যই আল্লাহর রাসূল, তা তাঁর শৈশবের অনেক ঘটনা থেকেই প্রকাশ পায়, যা কোন সাধারণ শিশুর পক্ষে সম্ভব নয়।

হযরত হালিমা বর্ণনা করেন, ”শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে আমার গৃহে আনার সাথে সাথেই রহমত বরকত প্রকাশ হতে লাগল। এতো পরিমাণ দুধ নির্গত হলো যে, হযরত (সা.) এবং তাঁর দুধ ভাই একান্ত তৃপ্তির সাথেই দুধ পান করে ঘুমিয়ে পড়তেন।” আর উটনীর দিকে চেয়ে দেখতে পাই, সেগুলোর স্তন দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।

বিবি হালিমা বলেন, ”আমার স্বামী উটনীর দুধ দোহন করলেন এবং আমরা তৃপ্তির সাথে তা পান করে সারারাত আরামে কাটালাম। দীর্ঘদিন পর এটাই প্রথম রাত্রি, যাতে আমরা শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম।” আমার স্বামী বললেন, ”হালিমা! তুমি খুবই ভাগ্যবান শিশু নিয়ে এসেছ।” আমি বললাম, আমারও এটাই ধারণা, এই শিশু অত্যন্ত সৌভাগ্যবান।

বিবি হালিমা আরও বলেন, ‍‍‍”মক্কা থেকে ফেরার পথে শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কেকোলে নিয়ে যে দুর্বল বাহনটিতে চলতে লাগলাম, মুহাম্মদ (সা.)-এরবরকতে বাহনটি এত দ্রুত চলল যে, সবার বাহনকেই হার মানাল।” আমার সাথী মহিলারা আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল এটা কি সেই দুর্বল সাওয়ারী যার ওপর আরোহণ করে তোমরা প্রথম এসেছিলে?” এরপর বাড়ী এসে দেখলাম, সমস্ত বকরীগুলো দুধে পূর্ণ হয়ে আছে। অথচ কিছুক্ষণ পূর্বে সেগুলো দুধ শূন্য ছিল।

আমার গোত্রের লোকেরা তাদের রাখালদের নির্দেশ দেয় যে, তোমরাও তোমাদের পশু ঐ জায়গায় চরাও যেখানে হালিমার বকরী চরে, কিন্তু তা তো চারণ ক্ষেত্রের বিশেষত্ব ছিল না। বরং গায়েবী মদদ ও বরকত এর মধ্যে নিহিত ছিল, তা ঐ সমস্ত লোক কোথায় পাবে। এভাবে আমরা প্রায়ই, তাঁর বরকতের ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করতাম।

হযরত হালিমা বর্ণনা করেছেন, তিনি কখনও শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে উলঙ্গ অবস্থায় রাখতে পারতেন না। সেরূপ করলেই তিনি চিৎকার করে কাটাতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তার শরীরের উপর চাদর টেনে দেয়া না হতো ততক্ষণ তিনি ক্রন্দন থামাতেন না।

হালিমা বলেন, যেদিন হতে আমি জানতে পারলাম, শিশু মুহাম্মদ (সা.) উলঙ্গ থাকতে পছন্দ করেন না, সেদিন হতে আর কখনও তাঁকে উলঙ্গ রাখিনি। তাঁর দেহ আবৃত করে রাখার জন্য সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখতাম।

হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসূল (সা.)-কে বলেছেন, আপনার নবুয়তের একটি মাত্র নিদর্শন ছিল আমার ইসলাম গ্রহণের কারণ। তা হলো, তিনি দেখলেন, রাসূল (সা.) শৈশব অবস্থায় আঙ্গুলী সংকেতে চাঁদকে ইশারা করছেন। রাসূল (সা.) যে দিকেই তাঁর আঙ্গুলী ফেরাচ্ছিলেন, চাঁদও ঠিক সে দিকেই আসা যাওয়া করছিল। (বায়হাকী)

রাসূল (সা.)নবী হওয়ার এও একটি উজ্জ্বল প্রমাণ। শিশু হযরত (সা.) হালিমার গৃহে থাকা কালে কখনও তাঁর উভয় স্তন হতে দুধ পান করেননি। সব সময় তিনি একটি স্তন থেকেই দুধ পান করতেন। অপরটি তাঁর দুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। ন্যায়বোধের এমন চরম দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে খুবই বিরল।

সত্যই এটা একজন মহামানবের পক্ষেই সম্ভব হতে পারে। শিশু রাসূল (সা.)-এর দ্রুত বর্ধনশীল দৈহিক অবস্থাও একটি লক্ষণীয় বিষয়। দু’মাস বয়সের সময় তিনি অন্যান্য শিশুদের সাথে হামাগুড়ি দিয়ে ফিরতে লাগলেন। তিন মাসের সময় দেয়াল ধরে হাঁটতে লাগলেন। যখন তাঁর বয়স মাত্র পাঁচ মাস তখন বিনা অবলম্বনে হাঁটতে শিখলেন। সাত মাস বয়সের সময় তিনি ফিরতে লাগলেন এবং মাত্র আট মাস বয়সের সময় তিনি কথা বলতে সক্ষম হন। তাঁর এই গুণগুলো নিশ্চই তাঁর মুজেযার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত এবং তিনিই উম্মতে মুহাম্মদীর শাফায়েতের কাণ্ডারী।

সারোয়ারে কায়েনাত দোজাহানের সম্রাট রাসূল (সা.) অতি শৈশবকাল থেকেই একান্তভাবে পাক সাফ থাকতেন। শিশুরা সাধারণত নিজের পায়খানা প্রস্রাব নিজের অঙ্গে প্রত্যঙ্গে বা জামা কাপড়ে মেখে থাকে, এমনকি তা মুখে দিয়ে থাকে। রাসূল (সা.)-এর দুধমাতা হালিমা (রাঃ) বর্ণনা করেন, ”শিশু মুহাম্মদ (সা.) কখনও বিছানায় পেশাব পায়খানা করে নিজ অঙ্গ বা কাপড় অপবিত্র করেননি। তাঁকে বিছানা থেকে উঠিয়ে দু’পায়ের উপর দাঁড় করান ব্যতীত কখনও পায়খনা পেশাব করতেন না। সাথে সাথে তাঁকে পরিষ্কার করে দিতাম। তিনি যে আল্লাহ্ তায়ালার সৃষ্ট নূরের তৈরি মানুষ তাতে আমার কোন সন্দেহ ছিল না। সুতরাং সর্বাবস্থায় পাক সাফ থাকা তাঁর পক্ষে অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মহানবী (সা.)-এর দেহ নূরের তৈরি বলে তাঁর শরীরের কোন ছায়া ছিল না। মানুষের ছায়া কত ময়লা-আবর্জনার ওপর পতিত হয়, কত পশু-পাখী অথবামানুষের পায়ের তলায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র দেহের ছায়া এভাবে অপদস্থ হওয়া আল্লাহ তা’আলার অভিপ্রেত নয়। এজন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর দেহ ছায়াহীন করে তৈরি করেছেন।

একই কারণে তাঁর দেহের ওপর কখনও মাছি বসেনি। কেননা মাছি অপবিত্র বস্তু হতে জন্ম লাভ করে। তাই মাছির দেহও অপবিত্র। তাই তা রাসূল (সা.)-এর শরীরে কোনদিন স্থান পায়নি।

হযরত মাইসারা (রাঃ) ছিলেন হযরত খাদিজা (রাঃ)-এর দাস। তাঁকে খাদিজা (রাঃ) রাসূল (সা.)-এর খেদমতে পেশ করেন। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করে বিম্ময়ে অভিভূত হয়েছেন।

তিনি দেখেছেন, রাসূল (সা.) যখন পথ দিয়ে চলতেন, তখন এক খণ্ড মেঘ তাঁর মাথার ওপর ছায়া বিস্তার করে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ভেসে বেড়াত। মানুষের প্রতি প্রকৃতির এই যে অযাচিত অভাবিক কার্যকলাপ, এটা নিঃসন্দেহে রাসূল (সা.)-এর একটি বড় রক মুজেযা। যা রাসূল (সা.)-এর শৈশবকাল থেকেই লক্ষ্য করা যায়।

উপরে বর্ণিত প্রত্যেকটি বিষয়ই রাসূল (সা.)-এর শৈশবকালীন মুজেযা। তবে এগুলো স্থায়ী নয়। বিশ্বনবীর জীবনে শ্রেষ্ঠ মুজেযা হচ্ছে আল-কোরআন। যা কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে।

তাছাড়া আমরা তাঁর জীবনী আলোচনা করলে দেখতে পাই, মহানবী (সা.)-এর পুরো সংগ্রামী জীবনটাই অলৌকিকতায় পরিপূর্ণ। যা তাঁর নবুয়তের জন্য যথেষ্ট প্রমাণ বহন করে।