মহানবী (সা.)-এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা

পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হলেন প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। মহান আল্লাহর পরই তাঁর স্থান।

তিনি প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন। তাঁর জ্ঞান মহাসাগরতুল্য। আর আল্লাহর জ্ঞানের কোনো তুলনা নেই। অনেকে অজ্ঞতার কারণে নবীর জ্ঞানকে আল্লাহর জ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করেন। এটি মারাত্মক ভুল। আল্লাহ নিজেই সে বিষয়ে আমাদের নিষেধ করেন। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আমাকে আমার হকের ওপর (মাত্রাতিরিক্ত) মর্যাদা দিয়ো না। কেননা মহান আল্লাহ আমাকে তাঁর রাসুল বানানোর আগে তাঁর বান্দা (গোলাম) বানিয়েছেন। ’ (মুজামে কবির, হাদিস : ২৮৮৯)

মহানবী (সা.)-এর জ্ঞান অর্জন

মহানবী (সা.)-কে মহান আল্লাহ সরাসরি জ্ঞান দান করেছেন। তিনি কারো কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্ঞান অর্জন করেননি। তাঁকে আল্লাহর কাছে সরাসরি জ্ঞান তালাশ করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘বলো, হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন। ’ (সুরা ত্বাহা, আয়াত : ১১৪)

এটাও সত্য যে মহান আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে অনেক অজানা জ্ঞান দান করেছেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ আপনার প্রতি গ্রন্থ ও বিজ্ঞান অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনি যা জানতেন না, তিনি তা-ই আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং আপনার প্রতি আল্লাহর অসীম করুণা রয়েছে। ’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১১৩)

মহানবী (সা.)-এর জ্ঞানের পরিধি

মহানবী (সা.)-কে তাঁর আগের ও পরের সব প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করা হয়েছে। তাঁকে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরআন দ্বারা সব জ্ঞান দান করা হয়েছে। এদিকে ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমার দায়িত্ব তা মুখস্থ করিয়ে দেওয়া আর তা আপনার বক্ষে ধারণ করিয়ে দেওয়া এবং পাঠ করার তাওফিক দেওয়া। তাই যখন আমি (জিবরাইলের সূত্রে) পড়ব, আপনি তাঁর অনুসরণ করুন, অতঃপর আমি আপনাকে বয়ান (ব্যাখ্যা) করে দেব। ’ (সুরা কিয়ামা, আয়াত : ১৭)

আর পবিত্র কোরআনে সব কিছু রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কোরআনে কোনো কিছু ছেড়ে দিইনি। ’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৩৮)

হজরত আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন চায়, সে যেন কোরআন পড়ে। কেননা এর মধ্যে আগের ও পরের জ্ঞান রয়েছে। ’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৩০৬৪১)

রাসুল (সা.) কি গায়েবের সব বিষয়ে অবগত?

গায়েবের পরিচয় দিয়ে ইবনে ফারিস (রহ.) বলেন, ‘গায়েব হলো যা তোমার থেকে অদৃশ্য। ’ (মুজমালুল লুগাত, পৃ. ৬৮৮)

মহানবী (সা.) সব গায়েবি বিষয় জানতেন না। বরং গায়েবের সব জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর গুণ। মহানবী (সা.) ততটুকু গায়েবি বিষয় জানতেন, যতটুকু তাঁকে মহান আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আকাশসমূহ ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে সব কিছু প্রত্যাবর্তিত হবে। সুতরাং তাঁর ইবাদত করো এবং তাঁর ওপর নির্ভর করো আর তোমরা যা করো, সে সম্পর্কে তোমাদের প্রতিপালক অনবহিত নন। ’ (সুরা হুদ, আয়াত : ১২৩)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আপনি বলুন! আমি তোমাদের এ কথা বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার রয়েছে, আর আমি অদৃশ্যের কোনো জ্ঞানও রাখি না। আমি তোমাদের এ কথাও বলি না যে আমি একজন ফেরেশতা। আমার কাছে যা কিছু ওহিরূপে পাঠানো হয়, আমি শুধু তারই অনুসরণ করে থাকি। আপনি তাদের জিজ্ঞেস করুন, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমমানের? সুতরাং তোমরা কেন চিন্তাভাবনা করো না?’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৫০)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে মুহাম্মদ তুমি ঘোষণা দিয়ে দাও—আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তা ছাড়া আমার নিজের ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি ইত্যাদি বিষয়ে আমার কোনো অধিকার নেই, আমি যদি অদৃশ্য তত্ত্ব ও খবর জানতাম, তবে আমি অনেক কল্যাণ লাভ করতে পারতাম আর কোনো অমঙ্গল ও অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারত না। আমি শুধু মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদবাহী। ’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৮৮)

মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘বলে দাও, আল্লাহ ছাড়া আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না। তারা জানে না, তারা কখন পুনরুত্থিত হবে। ’ (সুরা নামল, আয়াত : ৬৫)

গায়েবের সব বস্তুর চাবি আল্লাহর হাতে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘গায়েব বা অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে। তিনি ছাড়া আর কেউই তা জ্ঞাত নয়। স্থল ও জলভাগের সব কিছুই তিনি অবগত রয়েছেন। তাঁর অবগতি ছাড়া বৃক্ষ থেকে একটি পাতাও ঝরে না এবং ভূপৃষ্ঠের অন্ধকারের মধ্যে একটি দানাও পড়ে না, এমনিভাবে কোনো সরস ও নিরস সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫৯)

কিয়ামত কবে হবে, এ বিষয়ে মহানবী (সা.) জানতেন না। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই কিয়ামতের জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছে রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনি জানেন যা জরায়ুতে আছে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে তার মৃত্যু ঘটবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত। ’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ৩৪)

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘লোকেরা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এর জ্ঞান শুধু আল্লাহরই কাছে, তুমি এটা কী করে জানবে। সম্ভবত কিয়ামত শিগগিরই হয়ে যেতে পারে?’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৬৩)

কিয়ামতের দিন মহানবী (সা.)-কে তাঁর অনেক উম্মতের ব্যাপারে জানানো হবে। তিনি তাদের বিষয়ে আগে জানতেন না। হজরত আবদুল্লাহ (রা.) মহানবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘আমি হাউসে কাউসারে সবার আগে যাব। আর কিছু লোক আমার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হবে, আমার ও তাদের মাঝে পর্দা দেওয়া হবে। আমি বলব, তারা তো আমার উম্মত। তখন বলা হবে, আপনি জানেন না, তারা আপনার পরে কী উদ্ভাবন করেছে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫৭৬)

সারকথা হলো, মহান আল্লাহর জ্ঞান অসীম। তাঁর জ্ঞানের সঙ্গে কারো জ্ঞান তুলনা হতে পারে না। আর আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-কে প্রয়োজনীয় সব জ্ঞান দিয়েছেন ওহির মাধ্যমে। তাই আল্লাহর পরে মহানবী (সা.)-এর জ্ঞান সবচেয়ে বেশি। আর মানুষের স্তরভেদে আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান দিয়ে থাকেন। এ আলোচনা থেকে আরো জানা যায়, নবীরা গায়েবি সংবাদ ততটুকু জানেন, ওহির মাধ্যমে যতটুকু তাঁদের জানানো হয়।

লেখক : লেকচারার, আরবি বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE