ইসলামী পদ্ধতিতে রাত্রিযাপন

মুমিনের সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর জন্য নিবেদিত। তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত হবে আল্লাহর স্মরণে, আল্লাহর বিধান পালনের মাধ্যমে।

যেভাবে ইসলাম ঈমানদারের দিন অতিবাহিত করার নিয়ম শিক্ষা দিয়েছে, অনুরূপ রাত্রিযাপনেরও আদব-শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছে।

রাত আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি রাত ও দিনকে নিদর্শনস্বরূপ সৃষ্টি করেছি। ’ (সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ১২)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনি রাতকে মানুষের প্রশান্তির উপায় হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। ’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৯৬)

সন্ধ্যাকালীন কাজ

যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবে, শিশুদের ঘরে ঢুকিয়ে নেবে এবং ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবে। রাসুল (সা.) বলেন, “যখন রাতের আঁধার নেমে আসবে, তখন তোমরা তোমাদের শিশুদের আটকে রাখবে, কেননা এ সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে। আর যখন রাতের কিছু অংশ অতিক্রান্ত হবে, তখন তাদের ছাড়তে পারো। তোমরা ঘরের দরজা বন্ধ করবে এবং এ সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলবে, কেননা শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। ” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩০৪)

এশার নামাজের আগে ঘুমাবে না

এশার নামাজের আগে ঘুমানো ইসলামের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় কাজ। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এশার আগে ঘুমাতে নিষেধ করেছেন। আর তিনি এশার পর না ঘুমিয়ে গল্পগুজব করা পছন্দ করতেন না। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৯)

এশার পরে অপ্রয়োজনে রাত্রি জাগরণ করবে না

মহানবী (সা.) এশার নামাজের পর গল্পগুজব ও গভীর রাত পর্যন্ত অযথা জেগে থাকা অপছন্দ করতেন। তবে দ্বীনি শিক্ষা দিতে তিনি কখনো কখনো রাত জাগতেন। মুসলমানদের সম্পর্কে কল্যাণকর পরামর্শের জন্য অনেক সময় রাতে তিনি আবু বকর (রা.)-এর বাসায় যেতেন। (তাহাবি শরিফ, হাদিস : ৭২০৩)

হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, আমি রাসুল (সা.)-কে কখনো এশার আগে ঘুমাতে ও এশার পর গল্পগুজব করতে দেখিনি। এশার পর হয়তো জিকিরে মশগুল থাকতেন, নয়তো ঘুমিয়ে পড়তেন। এর দ্বারা সব অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে মুক্ত থাকা যায়। আয়েশা (রা.) বলেন, তিন ধরনের মানুষের জন্য রাত জাগার অনুমতি রয়েছে : বিয়ের রাতে নবদম্পতি, মুসাফির ও নফল নামাজ আদায়কারী। (মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস : ৪৮৭৯)

ঘুমানোর আগের প্রয়োজনীয় কাজ

একটি হাদিসে ঘুমানোর আগে সতর্কতাস্বরূপ প্রয়োজনীয় কয়েকটি কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা রাতে পানাহারের পাত্রগুলো ঢেকে রেখো। ঘরের দরজাগুলো বন্ধ রেখো। আর সাঁঝের বেলায় তোমাদের বাচ্চাদের ঘরে আটকে রেখো, কারণ এ সময় জিনেরা ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো কিছুকে দ্রুত পাকড়াও করে। নিদ্রাকালে বাতিগুলো নিভিয়ে দেবে। কেননা অনেক সময় ছোট ক্ষতিকারক ইঁদুর প্রজ্বলিত সলতেযুক্ত বাতি টেনে নিয়ে যায় এবং গৃহবাসীকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩১৬)

শোয়ার জায়গায় সতর্কতা

একাকী ঘরে রাত যাপনেরর ব্যাপারে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী করিম (সা.) কোনো ঘরে একাকী রাতযাপন ও একাকী সফর করতে নিষেধ করেছেন। ’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫৬৫০)

অনুরূপ ছাদে শোবে না। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি বেষ্টনীবিহীন ছাদে রাতে ঘুমাল, (কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে) তার সম্পর্কে (আল্লাহর) কোনো জিম্মাদারি নেই। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৪১)

পবিত্রতা অর্জন

রাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হয়ে শোয়া সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কোনো মুসলমান রাতে আল্লাহকে স্মরণ করে অজু শেষে শয়ন করে এবং রাতে জাগ্রত হয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাআলা তা দান করেন। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৪২)

তাই ঘুমানোর আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নেবে, যাতে খাবারের কোনো কিছু লেগে না থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শয়তান ঘ্রাণ নিতে খুবই দক্ষ ও লোভী। তোমরা নিজেদের ব্যাপারে শয়তান থেকে সতর্ক হও। কোনো ব্যক্তি খাদ্যের চর্বি ইত্যাদির ঘ্রাণ হাত থেকে দূর না করে রাত যাপন করলে এবং এতে তার কোনো ক্ষতি হলে সে এ জন্য নিজেকেই যেন তিরস্কার করে। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৮৫৯)

শয্যা গ্রহণের কিছু আদব

• শয্যা গ্রহণের আগে বিছানা ঝেড়ে নেওয়া উচিত। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যদি তোমাদের কেউ শয্যায় যায়, তখন সে যেন তার লুঙ্গির দ্বারা বিছানাটা ঝেড়ে নেয়। কারণ সে জানে না যে বিছানার ওপর তার অনুপস্থিতিতে পীড়াদায়ক কোনো কিছু আছে কি না। তারপর এ দোয়া পড়বে—হে আমার রব! আপনারই নামে আমার শরীরটা বিছানায় রাখলাম এবং আপনারই নামে আবার উঠব। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬৩২০)

• চোখে বেজোড় সংখ্যায় সুরমা লাগানো সুন্নত।

• ডান কাতে শয়ন করা সুন্নত।

• শয়নকালে দোয়া পড়া সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শয়নের পর আল্লাহর নাম নেয় না, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বঞ্চনা নেমে আসবে। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৫৬)

হাদিস শরিফে ঘুমানোর আগে কয়েকটি দোয়া বর্ণিত হয়েছে। সবগুলো দোয়া পড়তে না পারলে ছোট এ দোয়াটি পড়া যায় : ‘আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহ্ইয়া’—অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! তোমার নামে আমি শয়ন করছি এবং তোমারই দয়ায় আমি পুনর্জাগ্রত হব। ’

• সুরা এখলাস ও নাস-ফালাক পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া সুন্নত। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রাতে যখন বিছানায় যেতেন, তখন দুই হাত একত্রিত করে তাতে সুরা এখলাছ, ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁক দিতেন। অতঃপর মাথা ও চেহারা থেকে শুরু করে যত দূর সম্ভব দেহে তিনবার দুই হাত বুলাতেন। ’ (বুখারি, হাদিস : ৫০১৭)

• আয়াতুল কুরসি পাঠ করা সুন্নত : রাসুল (সা.) বলেন, “তুমি যখন শয্যা গ্রহণ করবে, তখন ‘আয়াতুল কুরসি’ পড়বে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বদা তোমার জন্য একজন রক্ষক থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। ” (বুখারি, হাদিস : ২৩১১)

রাত্রিকালীন কিছু কুসংস্কার ও অহেতুক বিশ্বাস

ইসলামপূর্ব আরবে অনেক ধরনের কুসংস্কার ও অহেতুক বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ থেকে সব কুসংস্কার দূর করেন। আরবরা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে বের হওয়ার আগে পাখি উড়াত, পাখিটি উড়ে ডান দিকে গেলে যাত্রা শুভ মনে করত, আর বাঁ দিকে গেলে অশুভ মনে করত। কারো বাড়িতে প্যাঁচা বসলে মনে করত গৃহবাসীদের নিকটতম কারো মৃত্যু হবে অথবা ঘর বিরান হয়ে যাবে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘এসব কুলক্ষণের কোনো বাস্তবতা নেই। ’ (বুখারি, হাদিস : ৫৭০৭)

ইসলামী জ্ঞানের অভাবে আমাদের সমাজেও নানা কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে। অনেক এলাকায়ই রাতকেন্দ্রিক কিছু অহেতুক বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। নিচে এর কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো, যেমন :

• রাতে নখ, চুল, দাঁড়ি, গোফ ইত্যাদি কাটতে নেই।

• রাতে আয়না দেখতে নেই।

• ঘরের ময়লা পানি রাতে বাইরে ফেললে সংসারে অমঙ্গল হয়।

• রাতে বাঁশ কাটা যাবে না।

• রাতে ফল পাড়া ও গাছের পাতা ছেঁড়া যাবে না।

• রাতে কাউকে সুইসুতা দিতে নেই।

• রাতে কোনো কিছুর লেনদেন করা ভালো নয়।

• রাতের বেলা কালোজিরার ভর্তা খেলে মায়ের জানাজা পায় না।

• খালি ঘরে সন্ধ্যাবাতি দিতে হয়, না হলে বিপদ আসে।

• রাতে কাক বা কুকুর ডাকলে বিপদ আসে।

• রাতে প্যাঁচার ডাককে বিপত্সংকেত মনে করে।

এ ছাড়া এলাকাভেদে আরো অনেক কুসংস্কারের প্রচলন রয়েছে। এসব মনগড়া কথা, ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই। একজন মুসলমানের কাজ হলো, সব ধরনের কুসংস্কার বাদ দিয়ে সব ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার ওপর দৃঢ় ঈমান ও সুদৃঢ় আস্থা রাখবে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার উম্মতের ৭০ হাজার লোক বিনা হিসেবেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা হবে এমন লোক, যারা শরিয়তে নিষিদ্ধ ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেয় না, কোনো বস্তুর শুভ-অশুভ মানে না। একমাত্র প্রতিপালকের ওপরই ভরসা রাখে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭২)

লেখক : ফতোয়া গবেষক

ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার

SHARE